
জহুরুল ইসলাম:
সিরাজগঞ্জের বেলকুচি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আনিসুর রহমান রোববার বলেছিলেন, সুবর্ণসাড়ায় মোতালেব সরকারের বাড়িতেই যে বোমা বিস্ফোরিত হয়েছে, তা এখনও নিশ্চিত নয় পুলিশ। নিহত ফজলু শেখের স্ত্রী-ছেলে বা স্বজন থানায় অভিযোগ দেননি। শুধু সংবাদ, মৃত্যুর ডাক্তারি সনদ বা প্রমাণপত্র দেখে একজনকে অভিযুক্ত করা যায় না। অথচ এদিন জেলা সিআইডির সদস্যরা মোতালেবের বাড়ি পরিদর্শন করে বোমা বিস্ফোরণের বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছেন। তারা বলছেন, থানা পুলিশের গড়িমসিতে আলামত পাশের খালে ডুবেছে।
১৯ ডিসেম্বর দুপুরে ওই বাড়িতে বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। স্থানীয় লোকজন এগিয়ে গেলেও বাড়িতে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। তারা পরে জানায়, কালো রঙের মাইক্রোবাসে আহত অবস্থায় দু’জনকে সরিয়ে নেওয়া হয়। কুষ্টিয়ার বাসিন্দা ফজলু শেখ শুক্রবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তাঁর স্বজনের বরাতে শাহবাগ থানা পুলিশ জানায়, বেলকুচির সুবর্ণসাড়ায় বিস্ফোরণে আহত হয়েছিলেন ফজলু।
জেলা সিআইডির পরিদর্শক মোহাইমিনুল সরকারের নেতৃত্বে একটি দল রোববার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। সোমবার তিনি বলেন, ‘তদন্তে দেরি হওয়ায় আলামত নষ্ট হয়েছে। দুর্বৃত্তরা আলামত গায়েবের সুযোগ পেয়েছে। তারপরও আমাদের খোঁজাখুজিতে খালের পানি থেকে কিছুটা আলামত পাওয়া গেছে।’ তাৎক্ষণিক অভিযান হলে আরও বেশি আলামত পাওয়া যেত জানিয়ে তিনি বলেন, ডুবুরি দল দিয়ে অনুসন্ধান করলে হয়তো ভবিষ্যতে আরও আলামত মিলবে বলে মনে করছেন।
বেলকুচি পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের সুবর্ণসাড়ার সরকার বাড়িতে থাকেন মোতালেব সরকারের দ্বিতীয় স্ত্রী খালেদা। মোতালেব উপজেলা শ্রমিক লীগের সাবেক সাংস্কৃতিক সম্পাদক। তিনি সিরাজগঞ্জ-৫ (বেলকুচি-চৌহালী) আসনের সংসদ সদস্য ও আসন্ন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আবদুল মমিন মণ্ডলের ঘনিষ্ঠজন।
সিআইডির তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, খালসংলগ্ন বাড়ির পেছনের বারান্দায় মেঝেতে বেশ কয়েকটি নতুন টাইলস বসানো। তাদের ধারণা, বিস্ফোরণের পর এগুলো বসানো হয়েছে। নতুন ও পুরোনো টাইলসের রঙে ভিন্নতা রয়েছে। দেয়ালও নতুন করে রঙ করা হয়েছে। তবে বিস্ফোরণে পুড়ে যাওয়ার কালো চিহ্ন দৃশ্যমান। সিআইডি কর্মকর্তারা বলছেন, মিস্ত্রি ডেকে কৌশলে টাইলসের ভঙ্গুর অংশ বদলে ফেলা হয়। দেয়ালেও রঙ দেওয়া হয়েছে। এর পর বিস্ফোরণের আলামত খালে ফেলে দেওয়া হয়।
যদিও প্রেসারকুকার-জাতীয় বস্তু বিস্ফোরণের দাবি করেছিলেন মোতালেবের স্ত্রী-স্বজনরা। তবে তারা সিআইডিকে এর পক্ষে কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেননি বলে জানা গেছে।
মোতালেব সরকার সোমবার বিকেলে সাংবাদিকদের বলেন, ‘সুবর্ণসাড়া গ্রামে আমার দ্বিতীয় স্ত্রীর খালেদার বাড়িতে সিআইডি দল এসেছিল। বিষয়টি পরে জেনেছি। নির্বাচনী প্রচারে এত ব্যস্ত, কখন কে আসছেন বা যাচ্ছেন, সেটি খেয়াল রাখাই কঠিন। ঘটনার পর ওসি সাহেবও দেখে গেছেন, আমি বাড়ি আছি। যদি অভিযুক্ত হতাম, তাহলে আপনাদের ফোনও ধরতাম না। বাড়ি থেকে পলাতাম।’
উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বেগম আশানুর বিশ্বাস বেলকুচি থানার ওসিকে বিতর্কিত কর্মকর্তা হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, বোমা বিস্ফোরণের আগে বেলকুচিতে চরমপন্থি-সর্বহারা বা অস্ত্রধারী ভাড়াটে সন্ত্রাসীর আনোগোনার আশঙ্কা জানিয়েছেন ওসিকে। কিন্তু তিনি কোনো গুরুত্বই দেননি। উল্টো শুরু থেকে তিনি একটি পক্ষের হয়ে কাজ করছেন।
বেলকুচির মেয়র সাজ্জাদুল হক রেজার অভিযোগ, বিশেষ মহলের প্রভাবে শুরু থেকেই থানা পুলিশ ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে। তদন্তের গড়িমসি করে অপরাধীদের আলামত গায়েবের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। সংবাদকর্মীদের কারণে তারা জানতে পারলেও এখনও পুলিশ সক্রিয় হয়নি।
উপজেলাবাসী বিস্ফোরণের আসল রহস্য জানতে চান– এমন মন্তব্য করে সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম সাজেদুল পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে সঠিক তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
ঢাকার শাহবাগ থানার ওসি মোস্তাফিজুর রহমান সোমবার দুপুরে সাংবাদিকদের বলেন, ওই বিস্ফোরণে নিহত কুষ্টিয়ার ফজলু শেখের ময়নাতদন্ত শেষে স্বজনরা রোববার লাশ নিয়ে গেছেন। পুলিশের সুরতহাল প্রতিবেদন ও ঢামেক হাসপাতাল থেকে দেওয়া কাগজপত্রে মৃত্যুর কারণ হিসেবে বিস্ফোরণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন হাতে পেলে বিষয়টি আরও নিশ্চিত হওয়া যাবে। সোমবার অবশ্য ফজলু শেখের ছেলে রাশেদ শেখের মোবাইল ফোনে কল দেওয়া হলেও ধরেননি।
বেলকুচি থানার ওসি আনিসুর রহমান বিকেলে বলেন, ‘বেলকুচিতে চরমপন্থি বা সর্বহারা বা অস্ত্রধারী ভাড়াটে সন্ত্রাসীর আনাগোনা সম্পর্কে পুলিশি গোয়েন্দা নজরদারি চলছে। মামলার বিষয়ে ভুক্তভোগী ফজলুর স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ করছি। দাফন-কাফন শেষে সামাজিক বিষয় নিয়ে তারা ব্যস্ত আছেন। হয়তো আসবেন। না আসলে পরবর্তী ব্যাবস্থা নেয়া হবে।