
জহুরুল ইসলাম:
একসময় সামান্য জমিতে হালচাষ করে সংসার চালাতেন বাবা। সন্তানদের পড়াশোনার খরচ জোগাতে গিয়ে বিক্রি করতে হয়েছে শেষ সম্বল জমিটুকুও। সেই কৃষকের ছেলে মো. সাজেদুল হক আজ সহকারী জজ। শুধু তাই নয়, ১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষার চূড়ান্ত ফলে ২০০ জন সাময়িকভাবে মনোনীত প্রার্থীর মেধা তালিকায় সারাদেশে ১২তম স্থান অর্জন করেছেন তিনি।
সাজেদুল হক সিরাজগঞ্জের বেলকুচি উপজেলার ধুকুরিয়াবেড়া ইউনিয়নের কৃষক মো. লুৎফর রহমানের জ্যেষ্ঠ ছেলে। তার এই সাফল্যে পরিবারে যেমন আনন্দের বন্যা বইছে, তেমনি গর্বিত এলাকাবাসীও।
ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার প্রতি প্রবল আগ্রহ ছিল সাজেদুলের। স্থানীয় ধুকুরিয়াবেড়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং বেলকুচি সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন তিনি। এরপর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হন। সেখান থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন।
তবে এই সাফল্যের পথটি মোটেও সহজ ছিল না। অভাবের সংসারে সন্তানদের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে বাবা লুৎফর রহমানকে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। পৈতৃকসূত্রে পাওয়া সামান্য জমিতে হালচাষ করে সংসার চালানো এই বাবা একপর্যায়ে সন্তানদের পড়াশোনার খরচ জোগাতে নিজের শেষ সম্বল জমিটুকুও বিক্রি করেন।
আজ সেই ত্যাগের ফল হাতে পেয়ে আবেগাপ্লুত বাবা লুৎফর রহমান।
তিনি বলেন, “আমার তিন সন্তানের মধ্যে সাজেদুল সবার বড়। পৈতৃকসূত্রে পাওয়া সামান্য জমিতে হালচাষ করেই সংসার চালাতাম। সন্তানদের পড়াশোনার খরচ চালাতে গিয়ে শেষ সম্বল জমিটুকুও বিক্রি করতে হয়েছে। আজ ছেলের এই সাফল্য দেখে মনে হচ্ছে, আমার জীবনের সব কষ্ট সার্থক হয়েছে।”
ছেলের জন্য দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়ে তিনি বলেন, তার ছেলে যেন একজন সৎ, ন্যায়পরায়ণ ও নিরপেক্ষ বিচারক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।
নিজের সাফল্যের অনুভূতি জানাতে গিয়ে সাজেদুল হক মহান আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, পরিবারের ত্যাগ ও কষ্ট ছাড়া আজকের এই অবস্থানে পৌঁছানো সম্ভব হতো না। পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে পেরেছেন—এটাই তার জীবনের সবচেয়ে বড় সার্থকতা।
তিনি বাবা-মা, শিক্ষক, আত্মীয়স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, জীবনের প্রতিটি ধাপে তাদের অনুপ্রেরণা তাকে এগিয়ে যেতে সাহস জুগিয়েছে।
সাজেদুল বলেন, নিষ্ঠা, সততা, মেধা ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে অর্পিত দায়িত্ব পালন করে দেশের মানুষের সেবা করতে চান তিনি। এজন্য সবার কাছে দোয়া কামনা করেছেন।
একজন কৃষক বাবার ঘাম, ত্যাগ আর বিসর্জনের পথ পেরিয়ে ছেলের সহকারী জজ হওয়া—সাজেদুলের এই সাফল্য তাই শুধু একটি চাকরি পাওয়ার গল্প নয়। এটি অভাবকে জয় করার গল্প, বাবা-মায়ের স্বপ্ন পূরণের গল্প এবং পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের কাছে কঠিন বাস্তবতাকে হার মানানোর গল্প।