
জহুরুল ইসলাম, বেলকুচি(সিরাজগঞ্জ) প্রতিনিধি:
সিরাজগঞ্জের বেলকুচিতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ (টিআর) কর্মসূচির আওতায় নেওয়া একটি প্রকল্পের বরাদ্দের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে ২২ জন এলাকাবাসীর স্বাক্ষরিত লিখিত অভিযোগ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে দেওয়া হয়েছে। অভিযোগটি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।
অভিযোগটি ধুকুরিয়াবেড়া ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের তালুকদার মেটুয়ানী গ্রামের মজনু মাস্টারের বাড়ি থেকে হুরাসাগর নদীর ঘাট অভিমুখী রাস্তা নির্মাণ প্রকল্প নিয়ে।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে টিআর কর্মসূচির আওতায় রাস্তাটি নির্মাণের জন্য সরকারি বরাদ্দ দেওয়া হলেও প্রকল্পটি যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা হয়নি। কাজ সম্পন্ন না করেই সংশ্লিষ্টরা বরাদ্দের অর্থ তুলে আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
এ ঘটনায় তালুকদার মেটুয়ানী গ্রামের ২২ জন বাসিন্দা স্বাক্ষর করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দেন। অভিযোগকারীদের দাবি, প্রকল্পের কাজ বাস্তবে কতটুকু হয়েছে, বরাদ্দের অর্থ কীভাবে ব্যয় করা হয়েছে এবং বিল কীভাবে উত্তোলন করা হয়েছে—এসব বিষয় সরেজমিন তদন্তের মাধ্যমে বের করা হোক।
অভিযোগকারী আব্দুল খালেক মোল্লা বলেন, তারা জানতে পারেন রাস্তাটির জন্য সরকারি বরাদ্দ এসেছে এবং কাজের উদ্বোধনও করা হয়েছে। পরে এলাকাবাসী সরেজমিনে গিয়ে দেখতে পান, উল্লেখযোগ্য কোনো কাজ হয়নি। এমনকি রাস্তার পাশের আগাছা ও ঝোপঝাড়ও পরিষ্কার করা হয়নি বলে দাবি করেন তিনি। এ কারণে রাস্তার কাজ সম্পন্ন করা অথবা অনিয়মের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
অভিযোগপত্রে স্বাক্ষরকারী ধুকুরিয়াবেড়া ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সহ-সভাপতি আলহাজ্ব ফজলুল হক বলেন, রাস্তাটি প্রায় ১৫ থেকে ২০ বছর আগে তৈরি হয়েছিল। এরপর দীর্ঘদিন কোনো সংস্কার হয়নি। সরকারি বরাদ্দের কথা শুনলেও বাস্তবে তিনি কাজ দেখতে পাননি বলে দাবি করেন।
৪ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সভাপতি নজরুল ইসলাম বলেন, তিনি শুনেছেন প্রকল্পে কাজ না করে সামান্য আগাছা পরিষ্কার করে বাকি টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে। তবে তার এই বক্তব্যও অভিযোগের অংশ; এর সত্যতা প্রশাসনের তদন্তেই নির্ধারিত হবে।
স্থানীয় কৃষক বাবলু বলেন, রাস্তার কিছু অংশ সমান করার মতো কাজ দেখা গেলেও প্রয়োজনীয় মাটি ফেলা হয়নি। সরকারি বরাদ্দের কাজ যথাযথভাবে সম্পন্ন করা উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
আরেক স্থানীয় কৃষক বিসা জানান, রাস্তার বেহাল অবস্থার কারণে কৃষকদের ফসল পরিবহনে দুর্ভোগ পোহাতে হয়। ফসল ঘরে নিতে অনেক সময় স্থানীয়দের নিজেদের অর্থে রাস্তা মেরামত করতে হয় বলে দাবি করেন তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দা শফিকুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে রাস্তাটিতে উল্লেখযোগ্য কোনো কাজ হয়নি। প্রকল্পের বরাদ্দ এলেও নতুন মাটি ফেলার মতো কাজ তিনি দেখতে পাননি বলে জানান।
এদিকে অভিযোগের বিষয়ে ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন প্রকল্পের সভাপতি ও ধুকুরিয়াবেড়া ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মোহাম্মদ এরশাদ আলম।
মুঠোফোনে তিনি বলেন, এটি সংসদ সদস্যের কোটায় নেওয়া প্রকল্প। প্রথম দফায় টাকা উত্তোলনের পর কাজ শুরু করেছিলেন। কিন্তু মাটি সংগ্রহের উৎসস্থলে পানি চলে আসায় কাজ বন্ধ রাখতে হয়েছে। প্রকল্পের কাজ এখনো চলমান এবং যতটুকু কাজ করার কথা, ততটুকুই শেষ করা হবে বলে দাবি করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, প্রকল্পের অর্থ থেকে তিনি কোনো টাকা নেবেন না এবং কেউ বাধা সৃষ্টি করলে তা তিনি মেনে নেবেন না।
অন্যদিকে, প্রকল্পের সচিব, বেলকুচি উপজেলা কৃষকদলের সিনিয়র সহ-সভাপতি ও ধুকুরিয়াবেড়া ইউনিয়ন পরিষদের বিএনপি দলীয় চেয়ারম্যান পদপ্রত্যাশী আলহাজ্ব রহিম উদ্দিন সরদার অভিযোগটি রাজনৈতিক বিরোধের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে দাবি করেছেন।
মুঠোফোনে তিনি বলেন, প্রকল্পের কাজ অনেক আগেই সম্পন্ন হয়েছে এবং প্রকল্পের বিলও উত্তোলন করা হয়েছে। তার দাবি, প্রায় ৮৫০ ফুট রাস্তার কাজ করা হয়েছে। স্থানীয় বিরোধ ও মামলা-মোকদ্দমার জের এবং আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে দলীয় মনোনয়নকে কেন্দ্র করে তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।
তবে প্রকল্পের কাজের প্রকৃত পরিমাণ, ব্যয়ের হিসাব এবং বিল উত্তোলন বিধি অনুযায়ী হয়েছে কি না—তা তদন্ত ছাড়া নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়।
এদিকে সিরাজগঞ্জ সংবাদের সরেজমিনে ধারণ করা ভিডিওচিত্রে দেখা যায়, মজনু মাস্টারের বাড়ি থেকে হুরাসাগর নদীর ঘাটমুখী রাস্তাটি বিভিন্ন স্থানে উঁচু-নিচু ও খানাখন্দে ভরা। রাস্তার দুই পাশে রয়েছে আগাছা ও পুরোনো গাছপালা। সরেজমিনে প্রকল্পের আওতায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ নতুন মাটি ফেলা বা রাস্তা নির্মাণের দৃশ্যমান চিহ্ন স্পষ্টভাবে দেখা যায়নি। তবে প্রকল্পের কাজের পরিমাণ নির্ধারণে সরকারি মাপজোক ও প্রকল্পের নথিপত্র যাচাই প্রয়োজন।
প্রকল্পের অনুমোদনসংক্রান্ত নথি অনুযায়ী, এটি সিরাজগঞ্জ-৫ নির্বাচনী এলাকার অনুকূলে টিআর কর্মসূচির আওতায় গৃহীত একটি প্রকল্প। সংশ্লিষ্ট সরকারি নথিতে সংসদ সদস্য, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার স্বাক্ষর রয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মোঃ আবু হেলালের কার্যালয়ে গেলে তাকে পাওয়া যায়নি। জানা যায়, তিনি প্রশিক্ষণে রয়েছেন।
বেলকুচি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আফরিন জাহান ক্যামেরায় বক্তব্য দিতে রাজি না হলেও জানান, তারা লিখিত অভিযোগ পেয়েছেন। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা প্রশিক্ষণে থাকায় তিনি সরেজমিনে গিয়ে বিষয়টি তদন্ত করবেন। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
এখন স্থানীয়দের মূল প্রশ্ন—সরকারি বরাদ্দের প্রকল্পটি বাস্তবে কতটুকু বাস্তবায়ন হয়েছে এবং বরাদ্দের অর্থ বিধি অনুযায়ী ব্যয় হয়েছে কি না?
অভিযোগ, পাল্টা দাবি ও সরেজমিনের চিত্র—সবকিছুর চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণ করবে উপজেলা প্রশাসনের তদন্ত ও প্রকল্প-সংক্রান্ত সরকারি নথিপত্র যাচাই এ। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার প্রত্যাশা করছেন স্থানীয়রা।