
তিন অডিট কর্মকর্তা পুলিশ হেফাজতে
জহুরুল ইসলাম:
সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জে গ্রামীণ ব্যাংকের নিমগাছী শাখার ব্যবস্থাপক মো. আবদুস সালামের (৫০) করুণ মৃত্যু হয়েছে। শাখায় অডিট চলাকালে তিনি বিষাক্ত ‘গ্যাস ট্যাবলেট’ সেবন করেন। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। তার মৃত্যুকে ঘিরে কিস্তি আদায়, লক্ষ্যমাত্রা ও অডিটের চাপ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
নিহত আবদুস সালামের বাড়ি পাবনার ঈশ্বরদীতে। তিনি স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে নিমগাছী এলাকায় বসবাস করতেন।
স্থানীয় ও ব্যাংককর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েক দিন ধরে নিমগাছী শাখায় অডিট কার্যক্রম চলছিল। এ সময় আবদুস সালাম মানসিকভাবে চাপে ছিলেন বলে দাবি সহকর্মীদের। ঘটনার দিন মঙ্গলবার সন্ধ্যায় তিনি সহকর্মীদের উদ্দেশে বলেন, ‘আমাকে বাঁচতে দেওয়া হলো না। আমি মারা যাব।’ এরপর তিনি ‘গ্যাস ট্যাবলেট’ সেবন করেন।
এ ধরনের ‘গ্যাস ট্যাবলেট’ সাধারণত অত্যন্ত বিষাক্ত পদার্থ হিসেবে পরিচিত। এটি সেবন করলে শরীরে গুরুতর বিষক্রিয়া তৈরি হতে পারে এবং দ্রুত চিকিৎসা না পেলে প্রাণহানির আশঙ্কা থাকে। তবে এ ঘটনায় কী ধরনের ট্যাবলেট সেবন করা হয়েছিল, তা চিকিৎসা ও তদন্তকারী কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদনের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
গুরুতর অবস্থায় তাকে প্রথমে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসার চেষ্টা করা হয়। পরে শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে রাত ৯টার দিকে তার মৃত্যু হয়।
আবদুস সালামের মৃত্যুর পর অডিট কার্যক্রমে থাকা তিন কর্মকর্তাকে স্থানীয় ব্যাংককর্মী ও এলাকাবাসী কিছু সময়ের জন্য আটকে রাখেন বলে জানা গেছে। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাদের নিজেদের হেফাজতে নেয়।

ব্যাংককর্মীদের অভিযোগ, কিস্তি আদায় ও নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণের চাপের পাশাপাশি দীর্ঘ কর্মঘণ্টা এবং অডিটের সময় নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয় তাদের। অনেক সময় সকাল থেকে রাত পর্যন্ত মাঠপর্যায়ে কাজ করতে হয় বলেও দাবি করেন তারা। এমনকি সরকারি ছুটির দিনেও কিস্তি আদায়ের জন্য মাঠে যেতে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
সহকর্মীদের কেউ কেউ দাবি করেন, এসব চাপ আবদুস সালামের মানসিক অবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল। তবে অডিটের চাপই তার মৃত্যুর সরাসরি কারণ—এমনটি এখনো তদন্তে নিশ্চিত হয়নি।
রায়গঞ্জ এলাকার গ্রামীণ ব্যাংকের কর্মকর্তা মো. মোহিউদ্দিন বলেন, অডিট চলাকালে কিছুটা চাপ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। কোনো অনিয়ম থাকলে অডিটররা সংশ্লিষ্টদের কাছে ব্যাখ্যা চান। আর মাসিক লক্ষ্যমাত্রা ব্যাংকের স্বাভাবিক প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রমের অংশ।
রায়গঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আহসানুজ্জামান জানান, তিনজন অডিট কর্মকর্তাকে আটকে রাখার খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায় এবং তাদের হেফাজতে নেয়। নিহতের মরদেহ ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে। এ ঘটনায় তখন পর্যন্ত কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি বলে জানান তিনি।
আবদুস সালামের মৃত্যু শুধু একজন ব্যাংক কর্মকর্তার করুণ পরিণতি নয়; এর মধ্য দিয়ে কিস্তিনির্ভর ঋণব্যবস্থা, কর্মীদের ওপর নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চাপ এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্মপরিবেশ নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন সামনে এসেছে।
বিশেষ করে ঋণগ্রহীতা ও কর্মী—উভয়ের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক ও মানসিক চাপ তৈরি করে এমন ব্যবস্থা কতটা মানবিক ও টেকসই, তা নিয়ে সমাজে আলোচনা প্রয়োজন। অর্থনৈতিক কার্যক্রমে ন্যায়সংগত, দায়িত্বশীল ও মানবিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সুদনির্ভর ও অতিরিক্ত ঋণনির্ভরতার বিকল্প নিয়েও নীতিনির্ধারক ও সংশ্লিষ্টদের ভাবার প্রয়োজন রয়েছে।
তবে আবদুস সালামের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং এর সঙ্গে অডিট বা কর্মক্ষেত্রের চাপের কোনো প্রত্যক্ষ সম্পর্ক ছিল কি না, তা তদন্তের মাধ্যমেই নিশ্চিত হওয়া সম্ভব।